ওমরাহর ৪টি মূল স্তম্ভ (রুকন ও ওয়াজিব)
একটি ওমরাহ সম্পূর্ণ হতে মূল ৪টি মৌলিক ধারাবাহিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়:
- ইহরাম (Ihram): নির্দিষ্ট মিকাত থেকে নিয়ত ও তালবিয়াহ পাঠ করা।
- তাওয়াফ (Tawaf): পবিত্র কাবা শরীফ ৭ বার প্রদক্ষিণ করা।
- সাঈ (Sa’i): সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে ৭ বার সাঈ করা।
- হলক বা কসর (Halq/Qasr): চুল মুণ্ডন করা অথবা ছোট করা।
ধাপে ধাপে ওমরাহ পালনের নির্দেশিকা
১ম ধাপ: ইহরাম ও মিকাত (Ihram & Meeqat)
- পরিচ্ছন্নতা অর্জন: সফর শুরু করার আগে বা মিকাতে পৌঁছানোর পূর্বে নখ কাটা, অপ্রয়োজনীয় চুল পরিষ্কার করা এবং সম্ভব হলে গোসল করা সুন্নাত।
- ইহরামের পোশাক: পুরুষরা দুটি সেলাইবিহীন সাদা সুতি চাদর (একটি পরনের জন্য, অন্যটি কাঁধে) পরিধান করবেন। মহিলারা শালীন যেকোনো সাধারণ ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করবেন (চেহারা ও হাত উন্মুক্ত থাকবে)।
- মিকাত অতিক্রম ও নিয়ত: এয়ারপোর্টে ফ্লাইটে ওঠার আগে অথবা ফ্লাইটে মিকাত অতিক্রমের আগে মনে মনে ও মুখে ওমরাহর নিয়ত করুন:
নিয়ত: “আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদুল ওমরাতা ফায়াসসিরহা লী ওয়া তাকাব্বালহা মিন্নী।” (হে আল্লাহ! আমি ওমরাহর নিয়ত করছি, এটি আমার জন্য সহজ করে দিন এবং কবুল করুন)।
- তালবিয়াহ পাঠ: নিয়তের পরেই পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং মহিলারা নিচুস্বরে তালবিয়াহ পাঠ শুরু করবেন:
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।”
২য় ধাপ: মক্কায় আগমন ও তাওয়াফ (Tawaf)
- হারাম শরীফে প্রবেশ: ডান পা দিয়ে মসজিদে হারামে প্রবেশ করুন এবং প্রবেশের দোয়া পাঠ করুন। প্রথমবার কাবা শরীফ দেখলে মন খুলে নিজের ও উম্মাহর জন্য খাস দোয়া করুন।
- তাওয়াফের প্রস্তুতি (ইজতিবা ও রামল): পুরুষরা তাওয়াফ শুরু করার আগে ডান কাঁধ খালি করে চাদরটি বাম কাঁধের ওপর এনে রাখবেন (ইজতিবা)। তাওয়াফের প্রথম ৩ চক্করে পুরুষরা হেলেদুলে বীরদর্পে একটু দ্রুত হাঁটবেন (রামল)।
- তাওয়াফ শুরু: হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) কোণ থেকে তাওয়াফ শুরু করতে হয়। হাজরে আসওয়াদের দিকে হাত তুলে “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলে ইস্তিলাম (হাত দিয়ে ইশারা) করে তাওয়াফ শুরু করুন।
- ৭ চক্কর সম্পূর্ণ করা: কাবা শরীফকে বামে রেখে ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে ৭ বার প্রদক্ষিণ করুন। রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝে এই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নাত:
“রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাঁও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাঁও ওয়াকিনা আজাবান নার।”
- তাওয়াফ শেষের কাজ: ৭ চক্কর শেষে চাদর দিয়ে উভয় কাঁধ ঢেকে নিন। মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে (বা সহজ স্থানে) ২ রাকাত তাওয়াফের ওয়াজিব নামাজ আদায় করুন এবং পেট পুরে জমজমের পানি পান করুন।
৩য় ধাপ: সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাঈ (Sa’i)
- সাঈ শুরু: সাফা পাহাড়ে উঠে কাবার দিকে মুখ করে দোয়া করুন। অতঃপর সাফা থেকে মারওয়া পাহাড়ের দিকে হেঁটে যান।
- সবুজ বাতির এলাকা: সাফা ও মারওয়ার মাঝে সবুজ বাতি চিহ্নিত অংশে পুরুষরা কিছুটা দ্রুত দৌড়ানোর ভঙ্গিতে হাঁটবেন।
- ৭ টি চক্কর গণনা: সাফা থেকে মারওয়া গেলে ১ চক্কর, আবার মারওয়া থেকে সাফায় ফিরে আসলে ২ চক্কর—এভাবে হিসাব করে মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে ৭ম চক্কর শেষ হবে।
৪র্থ ধাপ: চুল কাটা বা হলক/কসর (Halq / Qasr)
- পুরুষদের জন্য: পুরো মাথার চুল মুণ্ডন করা (হলক) উত্তম, অথবা মাথার সব স্থান থেকে সমানভাবে চুল ছোট করা (কসর)।
- মহিলদের জন্য: মাথার সব চুলের বেনী বা গোছা থেকে আঙুলের এক কর (প্রায় ১ ইঞ্চি) পরিমাণ চুল কাটতে হবে।
- ইহরাম ভঙ্গ: চুল কাটার মাধ্যমে আপনার ওমরাহের সার্বিক কার্যক্রম সম্পন্ন হলো এবং ইহরামের সমস্ত নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল।
ওমরাহর সময় সাধারণ ভুল ও সতর্কতা
| সাধারণ ভুল | সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান |
|---|---|
| মিকাত অতিক্রম করার পর নিয়ত করা | ফ্লাইটে মিকাত ঘোষণার আগেই ইহরামের কাপড় পরে নিয়ত নিশ্চিত করতে হবে। |
| তাওয়াফের চক্কর গণনায় ভুল করা | গণনার সুবিধার জন্য ডিজিটাল তসবিহ বা ৭ দানা বিশিষ্ট কার্ড ব্যবহার করতে পারেন। |
| ধাক্কাধাক্কি করা | হাজরে আসওয়াদ চুমু দিতে গিয়ে অন্য হাজিকে কষ্ট দেওয়া গুনাহ; দূর থেকে ইশারা করাই যথেষ্ট। |
| মহিলদের চেহারা ঢেকে রাখা | এহরাম অবস্থায় মহিলাদের চেহারা স্পর্শ করে এমন নেকাব পরিধান করা নিষেধ। |
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. এহরাম অবস্থায় সুগন্ধিযুক্ত সাবান ব্যবহার করা যাবে কি?
উত্তর: না, নিয়ত করার পর ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি সাবান, তেল, পারফিউম বা সুগন্ধিযুক্ত ভেজা টিস্যু ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষেধ।
২. মহিলাদের ওমরাহ করার জন্য মাহরাম থাকা কি বাধ্যতামূলক?
উত্তর: বর্তমান সৌদি নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়সের নারীরা দলবদ্ধভাবে (বিশ্বস্ত এজেন্সির অধীনে) মাহরাম ছাড়া ওমরাহ করতে পারেন, তবে ওলামায়ে কেরামের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।
৩. তাওয়াফের সময় অযু ভেঙে গেলে করণীয় কি?
উত্তর: তাওয়াফ অবস্থায় অযু ভেঙে গেলে তৎক্ষণাৎ তাওয়াফ থামিয়ে অযু করে এসে যে চক্করে অযু ভেঙেছিল, সেখান থেকে বা শুরু থেকে তাওয়াফ পুনরায় শুরু করতে হবে।
উপসংহার
প্রথমবার ওমরাহ পালন করা অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি অভিজ্ঞতা। নিয়মগুলো সহজ হলেও মনোযোগ ও সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা আপনার এই মোবারক সফরকে সহজ ও কবুল করুন।
আপনার পবিত্র ওমরাহ যাত্রাকে সহজ করতে চান?
নির্ঝঞ্ঝাট, আরামদায়ক ও নির্ভরযোগ্য ওমরাহ গাইডলাইনের জন্য Taqwa Hajj Group রয়েছে আপনার পাশে। আমাদের রেগুলার ও প্রিমিয়াম ওমরাহ প্যাকেজসমূহ সম্পর্কে জানতে আজই যোগাযোগ করুন।